ইত্তেহাদ স্পেশাল

নিস্তব্ধ ‘ফিরোজা’: সবই আছে, নেই শুধু প্রিয় মানুষটি

image 1767322286 uNj7MdoU7FXPCg8vyfpP6AIHIvMRjAK1FCh6N1vC
১১৮
print news

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : রাজধানীর গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’ এখন এক গভীর নিস্তব্ধতায় নিমজ্জিত। বাড়ির আসবাবপত্র, চারপাশের বাগান, প্রহরীদের ছাউনি, সবই আগের মতো আছে, শুধু নেই বাড়ির প্রিয় মানুষটি। গুলশানের এই বাসভবনের সামনে গিয়ে দেখা যায় এক বেদনাবিধুর পরিবেশ।

ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের যে বাড়িতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি হিসেবে ছিলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর সেটিই ছিল খালেদা জিয়ার একমাত্র ঠিকানা। কিন্তু এক-এগারোর পরে শেখ হাসিনা ক্ষমতা আসার পর তাকে সেই বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। এরপর থেকে গুলশানের ‘ফিরোজা’ই হয়ে ওঠে তার স্থায়ী নিবাস।

২০১৮ সালে এই বাসা থেকেই পুরনো ঢাকার আদালতে গিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলার রায়ে সরাসরি কারাগারে যান খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে করোনা মহামারির সময় আওয়ামী লীগ সরকারের বিশেষ শর্তে মুক্তি পেয়ে হাসপাতাল থেকে তিনি এই বাড়িতেই ফিরেছিলেন। আজও ফিরোজার ফটকে প্রহরীদের পাহারা রয়েছে, কিন্তু সবার চোখে-মুখে বিষণ্নতা। তারা আজ বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করেছেন। নিরাপত্তা কর্মীদের একজন অশ্রুসজল চোখে বলেন, ম্যাডাম সব সময় আমাদের খোঁজ নিতেন। ঠিকমতো খেয়েছি কি না, তা জিজ্ঞাসা করতেন। আজ ম্যাডাম নেই, পুরো বাড়িটাই যেন শূন্যতায় খাঁ খাঁ করছে।

বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, এই বাড়ির প্রতিটি কোণে বেগম জিয়ার অজস্র স্মৃতি মিশে আছে। যারা দীর্ঘ ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে উনার সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে আছেন, তাদের আবেগ ও অনুভূতি আজ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তাদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যারা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় থেকে ঢাকা সেনানিবাসের সেই বাসভবন হয়ে আজ অবধি ‘ফিরোজা’র সেবায় নিয়োজিত। দীর্ঘ সময় উনার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমিও যে হাহাকার অনুভব করছি, তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। এই বাড়ির পরতে পরতে এখনো যেন ম্যাডামের জীবন্ত উপস্থিতি অনুভব করা যায়।

বিএনপি চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী (সিএসএফ)-এর এক সদস্য বলেন, দীর্ঘদিন ম্যাডামের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলাম। আজ প্রিয় মানুষটি নেই, পুরো বাড়িটাই খালি। বাড়ির ভেতরে পা রাখলে এক অদ্ভুত শূন্যতা আর নিস্তব্ধতা আমাদের গ্রাস করে। এই কষ্ট ও বেদনার কথার বলার ভাষা আমাদের জানা নেই। শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন ম্যাডামকে পরপারে শান্তিতে রাখেন।

ফিরোজার পাশেই ১৯৬ নম্বর বাড়িটি ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তার পরিবারের জন্য বরাদ্দ দিয়েছিল তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সরকার। কয়েক মাস আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এই বাড়ির দলিলপত্র খালেদা জিয়ার হাতে হস্তান্তর করেন। বর্তমানে সেই বাড়িতে অবস্থান করছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

মায়ের মৃত্যুর পর আজ দিনভর ইবাদত-বন্দেগি, কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়ার মাধ্যমে সময় কাটাচ্ছেন তারেক রহমান। আত্মীয়-স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দিতে এলে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং মায়ের স্মৃতিচারণ করেন।

গুলশান এলাকাটি কূটনৈতিক জোনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সেখানে সাধারণের জমায়েত সীমিত থাকলেও স্থানীয় অনেক বাসিন্দাকে বাড়ির সামনে এসে নিরবে শোক পালন করতে দেখা গেছে।

গুলশানের বাসিন্দা হাসানুজ্জামান খান বলেন, ম্যাডাম নেই, এখন ভরসার জায়গাটায় রয়েছেন তারেক রহমান। সেজন্য এখানে এসে কিছু সময় তার শোকের সঙ্গী হচ্ছি। এই শোক শুধু তার একার নয়, এটা আমাদের সকলের শোক, এটা আমাদের গণতন্ত্র প্রিয় বাংলাদেশীদের শোক।

এদিকে, গুলশানে চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়েও বইছে শোকের ছায়া। কার্যালয়ে কালো পতাকা ওড়ানো হয়েছে এবং দলীয় ও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। সেখানে খোলা হয়েছে শোক বই। আজ শোক বইতে স্বাক্ষর করেছেন সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুর্শিদ, যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জেকবসন, ইরানের রাষ্ট্রদূত মনসুর চাভুশি, ছারছীনা দরবার শরীফের পীর মাওলানা শাহ আবু নছর নেছার উদ্দিন আহমেদ এবং জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারি।

গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা গেছে, কার্যালয়ের বাইরে নেতা-কর্মী ও গণমাধ্যম কর্মীদের ভিড়। যারা শোক বইতে স্বাক্ষর করতে যাবেন তাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে।

কার্যালয়ের সামনে নেতাকর্মীরা বলছেন, দলের চেয়ারপার্সন চলে যাওয়ায় তারা ভীষণ কষ্টের মধ্যে রয়েছেন। তবে, বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের ম্যাডামের জনপ্রিয়তার রেকর্ড কেউ ভঙ্গ করতে পারবে না বলে তারা বিশ্বাস করেন।

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার ভোরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। গতকাল বুধবার মানিক মিয়া এভিনিউতে জানাজা শেষে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জিয়া উদ্যানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই সমাহিত করা হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন....
ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক :

ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক :

About Author

etihad news is one of the famous Bangla news portals published from Abudhabi-UAE. It has begun with a commitment to fearless, investigative, informative, and independent journalism. This online portal has started to provide real-time news updates with maximum use of Smart Technology.