বাংলাদেশ ঢাকা

হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্সে ৬৯ কোটি টাকার অনিয়ম:

bnvc
৬৫
print news

ইত্তেহাদ নিউজ,ঢাকা : আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের আওতাধীন ‘বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইনান্স কর্পোরেশন’ আর ‘অনিয়ম-দুর্নীতি’ যেন একে অপরের পরিপূরক। কর্পোরেশনের বার্ষিক নিট লাভ থেকে সংরক্ষিত তহবিল বা তহবিলসমূহ প্রতিষ্ঠার পর বিধি অনুযায়ী উদ্বৃত্ত ৫২ কোটি ৫২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৪৭ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি। এক ঋণগ্রহীতার ঋণের বিপরীতে রাখা সম্পত্তির মূল দলিল উধাও হয়ে গেছে কর্পোরেশনের লকার থেকে। বিধি বহির্ভূতভাবে কমকর্তা-কর্মচারীরা দুপুরের খাবার বা লাঞ্চ বাবদ ৩ কোটি ৫৫ লাখ ৪২ হাজার ৫৫ টাকা নিয়েছেন। আর জালিয়াতর মাধ্যমে ফ্ল্যাট ঋণ এবং বন্ধক ও মর্টগেজ দলিল ছাড়াই ঋণ দেওয়াসহ হরেক রকম অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে এখানে।

হাউজ বিল্ডিং ফাইনান্স কর্পোরেশনে এমন সব অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশের কম্পট্রোলার এ্যান্ড অডিটর জেনারেল কিংবা বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের নিরীক্ষায় (অডিট)। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান অডিট অধিদপ্তর কর্পোরেশনের ২০১৮-১৯ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরের হিসাব সম্পর্কিত কার্যক্রমের ওপর কমপ্লায়েন্স অডিট বা নিরীক্ষা পরিচালনা করে। ২০২১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত নিরীক্ষায় কর্পোরেশনের মোট ৬৯ কোটি ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৪১ টাকার ঘাপলা ধরা পড়ে। অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী গত বুধবার সংবিধানের ১৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদে ৪৯টি অডিট ও হিসাব রিপোর্ট উপস্থাপন করেছেন। এর মধ্যে হাউজ বিল্ডিং ফাইনান্স কর্পোরেশনের হিসাব সম্পর্কিত কমপ্লায়েন্স রিপোর্টে উক্ত পরিমাণ অর্থের অডিট আপত্তির তথ্য রয়েছে। ৬৯ কোটি ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৪১ টাকার ঘাপলার বিবরণে সংসদে উপস্থাপিত অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছে, জালিয়াতির মাধ্যমে ফ্ল্যাট ঋণ বিতরণ করায় কর্পোরেশনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১০ কোটি ৮৪ লাখ ৬ হাজার ১৭৩ টাকা। কর্পোরেশনের বার্ষিক নিট লাভ থেকে সংরক্ষিত তহবিল বা তহবিলসমূহ প্রতিষ্ঠার পর বিধি অনুযায়ী অতিরিক্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ায় সরকারের ক্ষতি হয় ৫২ কোটি ৫২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৪৭ টাকা। ৩২ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরেও মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ আদায় না হওয়ায় কর্পোরেশনের ৩৫ কোটি ৪৫ লাখ ২ হাজার ৩০৪ টাকা ক্ষতি হয়েছে। ঋণ নীতিমালা ও মঞ্জুরিপত্রের শর্ত উপেক্ষা করে বন্ধক ছাড়াই ঋণ বিতরণ এবং আদায়ে ব্যর্থ হওয়ায় ক্ষতি হয়েছে ৩৯ কোটি ৮৩ লাখ ৩ হাজার ৬৬৯ টাকা।

লকার থেকে দলিল উধাও

অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছে, মিসেস তাজি আক্তার বেগম বাড়ি নির্মাণের জন্য ১৯৮৫ সালে হাউজ বিল্ডিং ফাইনান্স কর্পোরেশনের নারায়ণগঞ্জ শাখা থেকে ৭ লাখ ৩৪ হাজার টাকা ঋণ নেন। ২০২১ সালের ১ জুন ঋণের মেয়াদ শেষ হয়। ঋণের বিপরীতে তাজি আক্তারের রাখা সম্পত্তির মূল দলিল কর্পোরেশনের লকারে খুঁজে পাওয়া যায়নি। দলিল না পাওয়ায় ডিক্রিজারি পদ্ধতি কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে। যার কারণে, সুদে-আসলে ৩৭ লাখ ২৭ হাজার ২৯ টাকা আদায় করা অনিশ্চিত হয়ে গেছে।

এব্যাপারে অডিট অধিদপ্তর জানতে চাইলে জবাবে কর্পোরেশন জানিয়েছিল, এই ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলাটি উচ্চ আদালতে চলমান। এছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে অটিড অধিদপ্তরকে জানানো হয়, দায়ী কর্মকর্তাদের বিভাগীয় শাস্তি হয়েছে। তবে, কর্পোরেশন ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের জবাব গ্রহণযোগ্য হয়নি অডিট অধিদপ্তরের কাছে। চলমান মামলা নিবিড় তদারকির মাধ্যমে আপত্তিকৃত অর্থ দায়ীদের কাছ থেকে আদায় করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে অডিট রিপোর্টে।

লাভের ৫২ কোটি টাকা জমা হয়নি সরকারি কোষাগারে

কর্পোরেশনের বার্ষিক নিট লাভ থেকে সংরক্ষিত তহবিল বা তহবিলসমূহ প্রতিষ্ঠার পর বিধি অনুযায়ী অতিরিক্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ায় সরকারের ৫২ কোটি ৫২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৪৭ টাকা ক্ষতির পূর্ণ বিবরণে অডিট রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে নিট লাভ থেকে ডিবেঞ্চার রিডাম্পশন তহবিল বাবদ ৯৯ কোটি ৭৩ লাখ ২৮ হাজার ৫৪৭ টাকা রাখা হয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ২০২০ সালের ৫ জুলাই জারিকৃত নির্দেশনা অনুযায়ী ডিবেঞ্চার রিডাম্পশন তহবিলে থাকার কথা্ ৪৭ কোটি ২০ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। ফলে, সরকারের ক্ষতি হয়েছে ৫২ কোটি ৫২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৪৭ টাকা।

অভিযোগ সম্পর্কে হাউজ বিল্ডিং ফাইনান্স কর্পোরেশনের প্রধান কার্যালয়ের কাছে জানতে চেয়েছিল অডিট অধিদপ্তর। তবে ‘মূল আপত্তি অনুযায়ী জবাব দেওয়া হয়নি’ বিধায় তা গ্রহণযোগ্য হয়নি। আপত্তিকৃত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা করার সুপারিশ করা হয়েছে অডিট রিপোর্টে।

জালিয়াতির মাধ্যমে ফ্ল্যাট ঋণ

জালিয়াতির মাধ্যমে ফ্ল্যাট ঋণ বিতরণ করায় কর্পোরেশনের ১০ কোটি ৮৪ লাখ ৬ হাজার ১৭৩ টাকা ক্ষতির বিষয়ে অডিট রিপোর্টে বলা হয়, হাউজ বিল্ডিং ফাইনান্স কর্পোরেশনের গুলশান শাখা থেকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ডি ব্লকের ৮ নম্বর রোডের ২৬৬ নম্বর প্লটে ৭ তলা বিশিষ্ট ‘রিজ ক্রেস্ট’ এপার্টমেন্টে দুটি ফ্ল্যাটের বিপরীতে যথাক্রমে ৪০ লাখ ও ৪৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ঋণ দেওয়া হয়। ফ্ল্যাট বিক্রির চুক্তিপত্রে (অনিবন্ধিত) ফ্ল্যাটের মালিকের নাম মাহবুবুর রহমান। তবে, জমির মূল মালিকের সঙ্গে ডেভেলপারের সম্পাদিত নিবন্ধিত চুক্তিপত্র ও আমমোক্তারনামা দলিলে জমির মালিকের লেখা রয়েছে এ.এম মাহবুবুর রহমান, যা অসঙ্গতিপূর্ণ। নিরীক্ষায় দেখা যায়, স্ট্যাম্প কেনার তারিখের আগে চুক্তি করা হয়। এছাড়া ঋণের বিপরীতে অনিবন্ধিত বায়না চুক্তিপত্রের মূল কপি রাখা হয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রাপ্ত অর্থ আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে অডিট রিপোর্টে।

কমকর্তা-কর্মচারীদের লাঞ্চ বাবদ ৩ কোটি ৫৫ লাখ ৪২ হাজার ৫৫ টাকা

হাউজ বিল্ডিং ফাইনান্স কর্পোরেশনের প্রধান কার্যালয় এবং এর ২২টি শাখার ২০১৮-১৯ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরের নিরীক্ষায় দেখা যায়, কর্পোরেশন কর্তৃক ১ম থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিদিন ১৫০ ও ২০০ টাকা করে লাঞ্চ সাবসিডি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, ‘ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য চাকরি (ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান) (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০১৫’- এর অনুচ্ছেদ ১৬ মোতাবেক ১ম থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তারা লাঞ্চ সাবসিডি প্রাপ্য নন। ফলে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে ৩ কোটি ৫৫ লাখ ৪২ হাজার ৫৫ টাকা আদায় করার জন্য সুপারিশ করা হয় অডিট রিপোর্টে।

 

সর্বশেষ  গুরুত্বপূর্ণ  সব  সংবাদ, ছবি ,অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও লেখা পেতে আমাদের  ফেসবুক পেইজে  লাইক  দিয়ে  অ্যাকটিভ  থাকুন।  ভিজিট করুন : http://www.etihad.news

* অনলাইন  নিউজ পোর্টাল  ইত্তেহাদ নিউজে  লিখতে  পারেন  আপনিও। লেখার বিষয়  ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন  [email protected] ঠিকানায়

সংবাদটি শেয়ার করুন....
ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক :

ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক :

About Author

etihad news is one of the famous Bangla news portals published from Abudhabi-UAE. It has begun with a commitment to fearless, investigative, informative, and independent journalism. This online portal has started to provide real-time news updates with maximum use of Smart Technology.

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *