বাংলাদেশ খুলনা

সাতক্ষীরা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে দুর্নীতির অভিযোগ নির্বাহী প্রকৌশলী রিংকন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে

shatkira
১৪১
print news

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : সাতক্ষীরা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (EED) জেলার শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান। জেলার শতাধিক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ, সংস্কার, শ্রেণিকক্ষ সম্প্রসারণ, টয়লেট ও অন্যান্য অবকাঠামোগত কাজের দায়িত্ব এই দপ্তরের ওপর ন্যস্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই দপ্তর ঘিরে যে চিত্র উঠে আসছে, তা সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে। অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, দীর্ঘদিন ধরে দপ্তরের ভেতরে ঘুষ, অনিয়ম, দরপত্র কারসাজি ও সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ জমতে জমতে এখন প্রকাশ্যে আসছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সাতক্ষীরা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রিংকন বিশ্বাস।

গত কয়েক মাস ধরে ঠিকাদার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং দপ্তরের ভেতরের একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাহী প্রকৌশলী রিংকন বিশ্বাসের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রকল্পের ফাইল কার্যত এগোয় না-এমনটাই দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দপ্তরের ভেতরে এমন একটি প্রভাববলয় তৈরি করেছেন, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে শুরু করে অর্থ ছাড় পর্যন্ত প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ধাপ তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে কেউ তাঁর বিরাগভাজন হলে কিংবা তাঁর কথিত নির্দেশনা অনুসরণ না করলে ফাইল আটকে যাওয়াটা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

অনুসন্ধানের শুরুটা হয় ঠিকাদারদের অসন্তোষ থেকে। জেলার বিভিন্ন স্থানে বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ ও সংস্কারকাজ শেষ করেও একাধিক ঠিকাদার বিল না পাওয়ার অভিযোগ তুলতে থাকেন। কেউ কেউ জানান, কাজ শেষ হওয়ার পর মাসের পর মাস অফিসে ঘুরেও তারা বিল পাচ্ছেন না। আবার কোনো ক্ষেত্রে বিল আংশিক ছাড় করা হলেও বাকি অর্থ আটকে রাখা হচ্ছে। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখে দেখা যায়, অধিকাংশ ফাইলের শেষ ধাপ গিয়ে থেমে থাকে নির্বাহী প্রকৌশলীর টেবিলে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ঠিকাদার জানান, এখানে কাজ করতে হলে শুধু নিয়ম মেনে কাজ করলেই হয় না, বাড়তি কিছু ‘ম্যানেজ’ করতে হয়। এক ঠিকাদারের ভাষায়, “এখানে কাজ করতে হলে দুইটা জিনিস লাগে-ধৈর্য আর টাকা। টাকা না দিলে ধৈর্য পরীক্ষা নেওয়া হয়।” তাঁর দাবি, অফিসে কেউ সরাসরি ঘুষের কথা বলে না, কিন্তু কথাবার্তার ইঙ্গিত থেকেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। প্রথমে বলা হয় ফাইলে একটু সমস্যা আছে, পরে নতুন কাগজ চাই, এরপর বলা হয় ‘উপরে কথা বলতে হবে’।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ বা সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার পর বিল ছাড় করাতে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দিতে হয়-এমন অভিযোগ বহু ঠিকাদারের। প্রকল্পের আকার ও বাজেট অনুযায়ী এই অর্থের পরিমাণ ভিন্ন হয়ে থাকে বলে তারা জানান। কাজ যত বড়, কথিত লেনদেনের অঙ্কও তত বেশি-এমনটাই অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। পুরো প্রক্রিয়াটি সাধারণত ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয় বলে তারা দাবি করেন। প্রথমে মৌখিক ইঙ্গিত দেওয়া হয়, পরে কোনো মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়, সবশেষে সরাসরি ‘খরচের কথা’ বলা হয়।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফাইল এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরতেই থাকে। কখনো নতুন করে মাপজোকের কথা বলা হয়, কখনো আগের কাগজে ত্রুটি বের করা হয়। ফলে কাজ শেষ করেও তারা আর্থিক সংকটে পড়েন। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ঋণ নিয়ে কাজ করেছেন, কিন্তু বিল আটকে থাকায় সেই ঋণ শোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিল ছাড়ের পাশাপাশি দরপত্র প্রক্রিয়ায়ও ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যমতে, অনেক ক্ষেত্রে দরপত্রের শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়, যাতে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারই সুবিধা পায়। প্রকৃত প্রতিযোগী ঠিকাদারদের দরপত্রে কৃত্রিম কারিগরি ত্রুটি দেখিয়ে বাতিল করা হয়-এমন অভিযোগও রয়েছে। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিতে প্রভাব বিস্তার করে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নির্বাহী প্রকৌশলী রিংকন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে।

এক ঠিকাদার বলেন, “আগেই ঠিক করে দেওয়া থাকে কে কাজ পাবে। দরপত্র শুধু আনুষ্ঠানিকতা। আমরা কাগজ জমা দিলেও পরে বলা হয় টেকনিক্যাল সমস্যা আছে।” তাঁর দাবি, এসব সমস্যার কোনো বাস্তব ভিত্তি থাকে না, বরং পছন্দের ঠিকাদারকে জায়গা করে দিতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এই অনিয়মের ফলে সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘনের পাশাপাশি সরকারের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। প্রতিযোগিতা না থাকায় কাজের মান কমে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অনুসন্ধানে জেলার কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও অর্ধসমাপ্ত ভবন পড়ে আছে, কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে, আবার কোথাও কাগজে কাজ শেষ দেখানো হলেও বাস্তবে ভবনের বিভিন্ন অংশ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।

একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ছাদ থেকে পানি পড়ে, দেয়ালে ফাটল। কিন্তু কাগজে নাকি সব ঠিক। আমাদের শিক্ষার্থীরা ঝুঁকির মধ্যে ক্লাস করছে।” অভিভাবকদের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান চলায় শিক্ষার্থীদের জীবন হুমকির মুখে পড়ছে। তারা বলছেন, শিক্ষা খাতে অনিয়ম মানে সরাসরি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, দপ্তরের ভেতরে ও বাইরে একটি মধ্যস্থতাকারী নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সরাসরি লেনদেন এড়িয়ে যোগাযোগ রক্ষা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। দপ্তরের কিছু কর্মচারী এবং বাইরের কয়েকজন ব্যক্তি এই যোগাযোগের কাজ করে থাকেন বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। এর ফলে মূল অভিযুক্ত সবসময় সরাসরি সামনে না এসে আড়ালে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী রিংকন বিশ্বাস। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একটি মহল তাঁকে হেয় করতে এসব করছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর ভাষায়, “তদন্ত হলে সত্য বেরিয়ে আসবে।” তিনি আরও বলেন, সব কাজ সরকারি নিয়ম মেনেই করা হয় এবং তাঁর কোনো অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই।

তবে অভিযোগ ওঠার পরও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। একের পর এক অভিযোগ প্রকাশ্যে এলেও কেন এখনো কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় এক নাগরিক প্রতিনিধি বলেন, শিক্ষা খাতে দুর্নীতি মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই অনিয়ম আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

এ অবস্থায় শিক্ষাবিদ, অভিভাবক, ঠিকাদার প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ ও নিরপেক্ষ তদন্তের জোরালো দাবি উঠেছে। তারা চাইছেন, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক এবং তদন্তকালীন সময়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেওয়া হোক। তাদের মতে, দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের এই অনিয়ম ও দুর্নীতির সংস্কৃতি বন্ধ করা সম্ভব হবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন....
ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক :

ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক :

About Author

etihad news is one of the famous Bangla news portals published from Abudhabi-UAE. It has begun with a commitment to fearless, investigative, informative, and independent journalism. This online portal has started to provide real-time news updates with maximum use of Smart Technology.