ডিপিডিসি’র সাবেক প্রধান প্রকৌশলী বেলায়েতের অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পেয়েছে দুদক

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : দুর্নীতি দমন কমিশন ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলায়েত হোসেন এবং তার স্ত্রী শামসুন নাহারের জমি ও ফ্ল্যাটসহ বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পেয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘ডিপিডিসির সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে একটি তদন্ত দল বেলায়েত এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ঘুষের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্ত করছে। তদন্তের অংশ হিসেবে, দুদক এর আগে ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, সিটি কর্পোরেশন এবং ভূমি অফিসসহ ৭০টিরও বেশি সরকারি ও বেসরকারি অফিসে চিঠি পাঠিয়েছে। দু’জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের রেকর্ড চেয়ে নেওয়া হয়েছে। তথ্য পাওয়ার পর, দুদকের তদন্ত দল বেলায়েত এবং তার স্ত্রীর সম্পদের তথ্য যাচাই-বাছাই করে। তাদের বিরুদ্ধে আনা বেশিরভাগ অভিযোগের সত্যতার প্রমাণ পায় বলে তদন্তের সাথে জড়িত একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা শীঘ্রই কমিশনে আমাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেব এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সুপারিশ করব।’
পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের আব্দুল আলীর ছেলে বেলায়েত একসময় ছাত্রজীবনে পড়াশোনার খরচ বহন করতে হিমশিম খেতেন। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা শেষ করার পর তিনি বিদ্যুৎ খাতে চাকরিতে যোগদান করেন। তিনি ডিপিডিসির প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। চাকরিকালে, বেলায়েত কর ফাঁকি দিয়ে এবং সম্পদ গোপন করে নিজের এবং স্ত্রীর নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুসারে, বেলায়েত ধানমন্ডির একটি আবাসিক ভবনে দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালিক ছিলেন – প্রতিটির আয়তন ১,৮০০ বর্গফুট। তিনি ফ্ল্যাটগুলোর মূল্য ৯৪.১৮ লক্ষ টাকা ঘোষণা করেছিলেন, তবে সম্পত্তির প্রকৃত বাজার মূল্য ৪.৫ কোটি টাকারও বেশি বলে অনুমান করা হচ্ছে। এছাড়া খিলগাঁওয়ের উলন মৌজায় তার ৪১২.৫ শতাংশ জমি আছে, যার সরকারি মূল্য ২.৩ লক্ষ টাকা, কিন্তু জমির প্রকৃত মূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা। আরও ২.৮ কাঠা জমির মূল্য ৬.৭২ লক্ষ টাকা, কিন্তু সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য ১.২৫ কোটি টাকা।
রাজধানীর আফতাবনগরে তার দুটি প্লট রয়েছে- ৫ কাঠা এবং ১০ কাঠা। এবং আত্মীয়দের নামেও ডেমরা, আশুলিয়া, ঢাকার কেরানীগঞ্জ এবং গাজীপুরে বেশ কয়েক বিঘা জমি কিনেছেন তিনি। ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা জমা রেখেছেন। এছাড়া সম্পত্তি গোপন করার অভিযোগও রয়েছে। কারণ তার আয়কর রিটার্নে ব্যবসার উল্লেখ নেই। যদিও আদতে তিনি বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন।
অভিযোগ অনুসারে, তার ট্যাক্স রিটার্নে প্রকাশিত সম্পদের মধ্যে প্রায় ৫০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, সিঙ্গাপুর ও ভারতে বিদেশে চিকিৎসা খরচ এবং একাধিক অপ্রকাশিত বিনিয়োগও বাদ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে যে, তার স্ত্রী শামসুন নাহার, যিনি একজন গৃহবধু, যার কোনও দৃশ্যমান আয় ছিল না, তিনিও কয়েক কোটি টাকার সম্পদের মালিক। যদিও তার ট্যাক্স রিটার্নে প্রায় ৫৯ লক্ষ টাকার সম্পদের দাবি করা হয়েছে। তার একাধিক জমির মালিকানা আছে, যার মধ্যে রয়েছে হাজী পাড়া এবং রামপুরায় ২ কোটি টাকার জমি, ব্যাংকে বেশ কয়েকটি এফডিআর এবং তার নামে কেনা একটি টয়োটা করোলা, যা পরে বিদেশে এক আত্মীয়ের নামে নিবন্ধিত হয়েছিল।
বেলায়েত তার ট্যাক্স রিটার্নে নির্দিষ্ট যে সম্পদ দেখিয়েছেন, বাস্তবে প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ অনেক গুণ বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে। তদন্তের সাথে জড়িত একজন দুদক কর্মকর্তা বলেন, চলমান তদন্তে বেলায়েত এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রায় সমস্ত অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়েছে। আমরা তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির একটি নতুন অভিযোগ পেয়েছি। তাই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বিলম্ব হচ্ছে। ফোনে বারবার চেষ্টা করেও মন্তব্যের জন্য বেলায়েতের সাথে যোগাযোগ করা যায়নি।
উল্লেখ্য, পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের আব্দুল আলী এবং রাবেয়া বেগমের অভাবের সংসারে জন্ম মো. বেলায়েত হোসেনের। টিউশনি করে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালিয়েছেন, বাড়ির দিকেও নজর রেখেছেন। মোটকথা অনেক কষ্টে অতিবাহিত হয়েছে তাঁর ছাত্রজীবন। চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়ন শেষে ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষে চাকরি পান। বিদ্যুৎ বিভাগের চাকরি নয় যেন আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়ে যান। ডিপিডিসির প্রধান প্রকৌশলী পদ থেকে অবসর নেয়া বেলায়েত হোসেন নিজ নামে এবং তার গৃহিণী স্ত্রী শামসুন নাহারের নামে গড়ে তুলেন সম্পদের পাহাড়। সম্পদের তথ্য গোপন করে রাজস্ব ফাঁকি দেয়াসহ নানা জাল-জালিয়াতিরও আশ্রয় নেন স্বামী-স্ত্রী আয়কর রিটার্ন দাখিলে। তিনি ও তার পরিবার ব্যবহার করেন দুটি গাড়ি। একটি তার নিজের নামে ঢাকা মেট্রো গ ২৬-৫৪৮৩ এক্স করোলা বিআরটিএ’র রেজিস্ট্রেশন করা থাকলেও অন্য গাড়িটি ঢাকা গ ১৯-৪৮৩৮ এক্স করোলা গৃহিণী স্ত্রী শামসুন নাহারের নামে ক্রয় করে বিআরটিএ-তে রেজিস্ট্রেশন করে পরবর্তীতে আমেরিকা প্রবাসী আপন চাচা শ্বশুর মো. ইয়াকুব আলী শরিফ (যিনি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-২ থেকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য) এর ছেলে রুবায়েত শরিফের নামে রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন। তবে বেলায়েত হোসেনের চাচাতো শ্যালকের নামে রেজিস্ট্রেশন করানো হলেও বেলায়েত হোসেন ও তার পরিবারের সদস্যরা গাড়িটি নিয়মিত ব্যবহার করেন।
সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ সব সংবাদ, ছবি ,অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। ভিজিট করুন : http://www.etihad.news
* অনলাইন নিউজ পোর্টাল ইত্তেহাদ নিউজে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায় ।



