বাংলাদেশ ঢাকা

গুম করে হত্যার পর লাশ ফেলা হয়েছে বরিশালের বলেশ্বর ও বরগুনার পাথরঘাটায়

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন
১০৫
print news

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে আওয়ামী লীগের দেড় যুগের শাসনকালে গুম করে হত্যার পর অনেক ব্যক্তির লাশ ফেলা হয়েছে বরিশালের বলেশ্বর নদে ও বরগুনার পাথরঘাটায়। তা ছাড়া মুন্সিগঞ্জে একটি বেওয়ারিশ লাশ দাফনের কবরস্থান পাওয়া গেছে, যেখানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের দাফন করা হয়েছে।

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে। আজ সোমবার রাজধানীর গুলশানে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান কমিশনের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। কমিশনের কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলন করা হয়। এর আগে গতকাল রোববার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন। এর আগে আরও দুটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল।

চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কমিশনে ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে একাধিকবার দেওয়া ২৩১টি অভিযোগ এবং যাচাই-বাছাই শেষে গুমের সংজ্ঞার বহির্ভূত বিবেচনায় ১১৩টি অভিযোগ বাতিল করা হয়। ফলে মোট ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় ছিল। এর মধ্যে ২৫১ জন নিখোঁজ (যাঁদের সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি) এবং ৩৬ জনের গুম–পরবর্তী লাশ উদ্ধার হয়।
গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানে প্রতিবেদন নিয়ে সোমবার রাজধানীর গুলশানে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সেখানে কমিশনের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন।

মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘নিখোঁজদের ভাগ্য নির্ধারণে কমিশন দেশের বিভিন্ন জেলায় সম্ভাব্য ক্রাইম সিন, পিক-আপ প্লেস (তুলে নেওয়ার স্থান), আয়নাঘর ও ডাম্পিং প্লেস (যেখানে লাশ ফেলা হতো) পরিদর্শন করেছে। মুন্সিগঞ্জে একটি বেওয়ারিশ লাশ দাফনের কবরস্থান পাওয়া গেছে, যেখানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের দাফন করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। কারণ, সুরতহাল প্রতিবেদনে এটি প্রমাণিত যে দাফন করা লাশের মাথায় গুলি এবং দুই হাত পিছমোড়া করে বাঁধা অবস্থায় ছিল।’

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সভাপতি আরও বলেন, বরিশালের বলেশ্বর নদে এবং বরগুনার পাথরঘাটায় ডাম্পিং প্লেসের সন্ধান পাওয়া গেছে। বরিশালে দুটি দেহ উত্তোলন ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে কমিশন এ কাজের সূচনা করে। পরে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ শনাক্তে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। কমিশন অজ্ঞাতপরিচয় ও বেওয়ারিশ মরদেহ শনাক্ত করে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে একটি ব্যাপক ডিএনএ তথ্যভান্ডার গঠনের সুপারিশ করেছে।

গুমের ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে জন্য কিছু সুপারিশ করেছে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন। সংবাদ সম্মেলনে কমিশন জানায়, বলপূর্বক গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান ঘটাতে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্তি ও অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব থেকে সশস্ত্র বাহিনীকে প্রত্যাহারের সুপারিশও রয়েছে।

এর বাইরে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ বাতিল বা মৌলিক সংশোধন, সমাজভিত্তিক প্রতিরোধমূলক সন্ত্রাসবিরোধী নীতি প্রণয়ন, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস আইন, ২০০৩-এর ১৩ ধারা বাতিল, সব বাহিনীকে কঠোর আইনি জবাবদিহির আওতায় আনা, বাধ্যতামূলক মানবাধিকার প্রশিক্ষণ, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণ এবং সত্য, স্মৃতি ও জবাবদিহির প্রতীক হিসেবে ‘আয়নাঘরগুলোকে’ জাদুঘরে রূপান্তরের সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

কমিশনের সদস্য সাজ্জাদ হোসেন জানান, সারা দেশে মোট ৪০টি ডিটেনশন সেন্টার বা গোপন বন্দিশালার সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২২–২৩টি বন্দিশালাই র‌্যাবের। এ ছাড়া গুম কমিশন কাজ শুরু করার পর র‍্যাবই সবচেয়ে বেশি গুমের আলামত ধ্বংস করেছে।

নাক গলায় গোয়েন্দা সংস্থা

এক প্রশ্নের জবাবে মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, প্রতিটি গোয়েন্দা সংস্থার সংস্কার লাগবে। দেশের গোয়েন্দা সংস্থা কী করে? তারা রাজনীতিতে নাক গলায়। কেন নাক গলায়? কারণ, তারা ক্ষমতার অংশ হতে চায়।

কমিশনের প্রধান বলেন, এস আলমের পক্ষে ডিজিএফআই গিয়ে ইসলামী ব্যাংক দখল করছে। এটা কি ডিজিএফআইয়ের কাজ ছিল? বা কোনো মিডিয়া হাউস দখল করা কি ডিজিএফআইয়ের কাজ বা কোনো গোয়েন্দা সংস্থার কাজ? তাদের নানাভাবে অপব্যবহার করা হয়েছিল।

এক প্রশ্নের জবাবে কমিশনপ্রধান বলেন, ‘ডিজিএফআই থাকতে হবে। ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি থাকতে হবে; কিন্তু এটা রিফর্ম করতে হবে। তাদের যে এসওপি (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরস) আছে বা যে গ্রিন বুক, সেটাও চেঞ্জ করতে হবে। আমরা সাজেস্ট করছি, যাতে ডিজিএফআইয়ের রিফর্ম করা হয়। তারা যাতে তাদের কাজ ছেড়ে অন্য কাজ না করে।’

অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, গোয়েন্দা সংস্থা যাতে ব্যাংক দখল না করে, মিডিয়া হাউস দখল না করে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যাতে নাক না গলায় সে জায়গাগুলো নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা লাগবে।

কোন বাহিনী কত গুম করেছে

সংবাদ সম্মেলনে কমিশন জানায়, প্রায় ২৫ শতাংশ গুমের অভিযোগে র‍্যাব জড়িত, এরপর পুলিশ ২৩ শতাংশ। এ ছাড়া ডিবি, সিটিটিসি, ডিজিএফআই ও এনএসআই ব্যাপকহারে গুম করেছে। বহু ক্ষেত্রে সাদাপোশাকধারী বা ‘প্রশাসনের লোক’ পরিচয়ে অপহরণ করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর ধরন থেকে এটা স্পষ্ট যে গুম একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত চর্চা হিসেবে র‍্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দ্বারা একক ও যৌথ অভিযানে সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন অসদাচরণের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় সমন্বিত কার্যক্রমের ইঙ্গিত দেয়।

বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, গুমসংক্রান্ত অভিযোগগুলোর মধ্য থেকে ফিরে না আসা ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত ও নিষ্পত্তির লক্ষ্যে চার ধাপে কিছু অভিযোগ পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে আনা দুই থেকে পাঁচ দিনের গুমের অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পৃথকভাবে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে ছয় মাসের মধ্যে মানবাধিকার কমিশনকে অগ্রগতি জানাতে বলা হয়েছে।

পুশ ইন হওয়া ব্যক্তিদের তথ্য যাচাই

সংবাদ সম্মেলনে কমিশনপ্রধান বলেন, দেশের সীমান্তবর্তী জেলার পুলিশ সুপার ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সেক্টর কমান্ডারদের কাছ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশ ইন করা ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সেখানে গুমের শিকার কোনো ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়নি। তবে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর ঢাকার ধামরাইয়ের বাসিন্দা গুমের শিকার মোহাম্মদ রহমত উল্লাহকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর সীমান্ত দিয়ে পুশ ইন করার একটি নির্দিষ্ট ঘটনা কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন কারাগারে আটক প্রথম দফায় ১ হাজার ৫২ জন এবং দ্বিতীয় দফায় ৩ হাজার ২৮৫ জন বাংলাদেশি নাগরিকের তালিকা কমিশন পেয়েছে। সেগুলো যাচাইয়ের পর গুমের শিকার কোনো ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়নি। ওই তালিকার কিছু তথ্য অসম্পূর্ণ ও অস্পষ্ট হওয়ায় বিষয়গুলোর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়ে ও হালনাগাদ তথ্য চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ওই চিঠির অগ্রগতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে অবহিত করতে বলা হয়েছে।

 

সর্বশেষ  গুরুত্বপূর্ণ  সব  সংবাদ, ছবি ,অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও লেখা পেতে আমাদের  ফেসবুক পেইজে  লাইক  দিয়ে  অ্যাকটিভ  থাকুন।  ভিজিট করুন : http://www.etihad.news

অনলাইন  নিউজ পোর্টাল  ইত্তেহাদ নিউজে  লিখতে  পারেন  আপনিও। লেখার বিষয়  ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন  [email protected] ঠিকানায় ।

সংবাদটি শেয়ার করুন....
ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক :

ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক :

About Author

etihad news is one of the famous Bangla news portals published from Abudhabi-UAE. It has begun with a commitment to fearless, investigative, informative, and independent journalism. This online portal has started to provide real-time news updates with maximum use of Smart Technology.