এক পা এগিয়ে দুই পা পিছিয়েছে জাপা

রাজপথে সক্রিয় হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও পিছিয়ে গেছে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা)। বিএনপির আন্দোলন এবং বিদেশিদের তৎপরতায় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন আসবে– এ ধারণার প্রতিফলন না ঘটায় পিছু হটেছে দলটি। সরকারের সঙ্গে থাকতে দলটির প্রায় সব এমপি ও অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ নেতার চাপ রয়েছে। ভারত থেকে ফিরে জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের চুপ রয়েছেন।
সূত্রের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ শক্তিধর দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে রয়েছে সংসদের বিরোধী দলটি। দলটির ওপর ভারতের প্রভাব থাকায় দেশটির অবস্থান অনুযায়ী সরকারের দিকে রয়েছে জাপা। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তির তৎপরতায় নির্বাচনের আগে বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে দলটির অবস্থানের বদল হবে না।
জাপার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও টালমাটাল। গত ১৯ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। এর তিন দিনের মাথায় রওশনের অনুসারীরা তাঁকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। পরবর্তী সময়ে ওই বিজ্ঞপ্তি ভুয়া বলে দাবি করা হয়। তবে তা ছড়ানোর পেছনে ‘সরকারি সংস্থার ঘনিষ্ঠ’ হিসেবে পরিচিত দুই নেতার হাত থাকায় জাপায় অস্থিরতা কমেনি।
বিএনপি ও সমমনা দলগুলো নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে রাজপথে রয়েছে। তাদের পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে আওয়ামী লীগও শরিকদের নিয়ে মাঠে রয়েছে। নির্বাচনের আগে আলোচনায় থাকতে জাপাও রাস্তায় নামতে চেয়েছিল। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সুষ্ঠু নির্বাচন, সুশাসনসহ ১০ দফা দাবিতে পথসভা, লংমার্চ কর্মসূচি ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়েছিল দলটির গত ৫ আগস্টের যৌথ সভায়। দু’দিন পর জি এম কাদের সমকালকে বলেছিলেন, ‘আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বিস্তারিত জানানো হবে।’
রাস্তায় নামার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু।
তিনি সমকালকে বলেছেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে রাস্তায় থাকার চেয়ে সংসদে কথা বলা ভালো। অধিবেশন শুরু হয়েছে। সেখানে দ্রব্যমূল্য, সুশাসন, দুর্নীতি নিয়ে কথা বলছে জাতীয় পার্টি। সড়কে সভা-সমাবেশ করে বক্তৃতা করার চেয়ে সংসদে কথা বলা বেশি কার্যকর।’
সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে সরব হওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে জাপা সরে এসেছে কিনা– প্রশ্নে মুজিবুল হক বলেন, ‘বিএনপি সরকার পতনের এক দফা নিয়ে আন্দোলন করেছে। জাতীয় পার্টির এমন এক দফা নেই। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। তারপর অবস্থান জানাব।’
চলতি মাসের শেষ দিকে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং এমপিদের যৌথ সভা হতে পারে। আগের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, পরবর্তী বৈঠকে ঠিক হবে আগামী নির্বাচনে কোন দিকে যাবে, কার সঙ্গে জোট করবে জাপা।
দলটির চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, ‘ওই অবস্থা আর নেই। এখনই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে বিদ্যমান পরিস্থিতির বদল না হলে ২০১৮ সালের মতো আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করবে জাতীয় পার্টি। আর বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলে ২০১৪ সালের মতো আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচন করবে।’
সংরক্ষিত আসনের চারজনসহ জাপার এমপি সংখ্যা ২৭। তাদের সবাই সরকারের পক্ষে। তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করতে চান। তারা মনে করেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত। এই মুহূর্তে বিএনপির সঙ্গে রাস্তায় নামলে জাপার ওপর অত্যাচার-নির্যাতন হবে। বিএনপির তা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও জাপার নেই। আগামী নির্বাচনেও ভরাডুবি হবে। ২০১৮ সালের মতো নির্বাচন হলে জাপা কোথাও জিততে পারবে না। সরকারি দলকে মোকাবিলার শক্তি না থাকায় অস্তিত্ব সংকট তৈরি হবে।
গত মাসে যৌথ সভায় তারা এই মতামত জানিয়েছেন বলে জাপা সূত্র জানায়। এমপি নন, এমন কয়েকজন প্রেসিডিয়াম সদস্য বিকল্প পথ খোলা রাখার পরামর্শ দিলেও তা হালে পানি পায়নি। জি এম কাদের তাদের মতামত মূল্যায়নের কথা বললে জাপা মহাসচিব সভায় বলেছিলেন, ‘শুধু আদর্শ দিয়ে দল চলে না। সংসদে বেশি সংখ্যক এমপিও থাকতে হবে। নইলে দল থাকবে না।’
ভারত সফরে যাওয়ার আগে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে সরব ছিলেন জি এম কাদের। নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে দাবি করে এর জন্য আওয়ামী লীগ সরকারকে দায়ী করে কড়া সমালোচনা করছিলেন। গত ২৩ আগস্ট দেশে ফেরার পর দুই সপ্তাহ ধরে নীরব রয়েছেন তিনি। বিবৃতি দিলেও সভা-সমাবেশে আসছেন না। গত ৩০ আগস্ট সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললেও ভারত সফর নিয়ে কিছু বলেননি।
জাপা সূত্রের খবর, তিন দিনের সফরে জি এম কাদের ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা ছাড়া উচ্চপর্যায়ের কারও সঙ্গে বৈঠক করতে পারেননি। দেশটির মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদেরও সাক্ষাৎ পাননি। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশসংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
জি এম কাদেরের মতো তাঁর উপদেষ্টা মশরুর মওলাও বলেছেন, ‘ভারত নির্বাচন নিয়ে কোনো বার্তা দেয়নি। দেশটি চায়, বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। ভোটের আগে-পরে যেন সহিংসতা না হয়। যুক্তরাষ্ট্রও তো একই কথা বলছে।’ ক্ষমতাসীন নেতা ও মন্ত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেছেন, ‘ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। সেখানে প্রয়োজনীয় কথা হয়েছে।’ তবে বিস্তারিত জানাননি তিনি।
জাপার একাধিক কো-চেয়ারম্যান বলেছেন, জি এম কাদেরের ভারত সফর সম্পর্কে কিছুই জানেন না তারা। কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে জ্যেষ্ঠ নেতাদের জানানো হয় না। জি এম কাদের ও মশরুর মওলা বৈঠক করেন। মাঝে মধ্যে মহাসচিব থাকেন। বাকিদের ডাকা হয় না।
রওশন এরশাদের রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ বলেন, জাপা যে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে, তা দূর হয়ে যাবে। রওশন এরশাদ ও জি এম কাদের মিলিতভাবে নির্বাচনে অংশ নেবেন। সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ‘আগামী নির্বাচন কঠিন হবে, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা একমত হয়েছেন। তা মাথায় রেখে প্রস্তুতি নিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।’
জাপা সূত্রের ভাষ্য, দলের প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জীবদ্দশা থেকেই সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও প্রয়াত মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সমঝোতার বিষয়টি দেখতেন। বাবলুর মৃত্যুর পর তা দেখভাল করেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং বর্তমান মহাসচিব। সরকারের অনাপত্তিতে তিনি মহাসচিব হয়েছেন। দলে তাদের দু’জনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তাই রাজনৈতিক পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন না হলে জাপা আওয়ামী লীগের সঙ্গেই থাকবে।
ভারতে যাওয়ার আগে ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করেছিলেন জি এম কাদের। জাতীয় পার্টিকে তখন সরকারের সমালোচনায় যতটা কঠোর দেখা গেছে, তা গত দুই সপ্তাহে দেখা যায়নি। দলটির সূত্রের ভাষ্য, জি এম কাদেরের অনুমান বাংলাদেশের নির্বাচন বিষয়ে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একবিন্দুতে আসবে। দুই বড় শক্তির অবস্থান দেখে নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে জাপা। দুই দেশ একমত না হলে ভারতের অবস্থানের দিকে তথা আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকবে দলটি।
সূত্র : সমকাল



