ইত্তেহাদ স্পেশাল

বরিশাল টিটিসিতে দীর্ঘদিনের পদায়নে গড়ে উঠেছে সিন্ডিকেট, জিম্মি প্রশিক্ষণার্থীরা

বরিশাল টিটিসি
২৮৪
print news

ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : সরকারি চাকরি বিধিমালায় একই পদ বা কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালনের সুযোগ সীমিত থাকলেও বরিশাল কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) যেন সেই নীতির ব্যতিক্রমী উদাহরণ। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কয়েকজন কর্মকর্তা ও প্রশিক্ষক দুই থেকে তিন দশক ধরে একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে প্রশিক্ষণার্থীদের ওপর।

দীর্ঘ পদায়নের চিত্র

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, বরিশাল টিটিসিতে একাধিক প্রশিক্ষক চাকরির শুরু থেকেই একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রশিক্ষক মো. মোস্তাফিজুর রহমান ১৯৯৩ সাল থেকে, ফিরোজ হোসেন খান ১৯৯৪ সাল থেকে, খান মাহবুব হোসেন ১৯৯৫ সাল থেকে এবং আনোয়ার হোসেন, বিলকিস আরা বেগম ও নমিতা রানী ২০০১ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। এছাড়া প্রশিক্ষক লায়লা আফরোজ ২০০৩ সাল থেকে, গণিত শিক্ষক শহিদুল ইসলাম ২০০৪ সাল থেকে এবং মো. মাহমুদ দীর্ঘদিন ধরে একই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন।

অন্যদিকে প্রকৌশলী মো. গোলাম কবির ২০১৯ সালের মার্চে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দিয়ে টানা সাত বছর ধরে একই পদে রয়েছেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানে এত দীর্ঘ সময় একই পদায়ন সাধারণত ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচিত হলেও বরিশাল টিটিসিতে তা নিয়মে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ।

সিন্ডিকেটের অভিযোগ কীভাবে

প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘদিন একই জায়গায় থাকার সুযোগ নিয়ে কিছু কর্মকর্তা ও প্রশিক্ষক মিলে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রায় ২০ জন প্রশিক্ষকের মধ্যে ৭ থেকে ৮ জন এই সিন্ডিকেটের অংশ বলে অভিযোগ রয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কোর্স ব্যবস্থাপনা এমনকি প্রশিক্ষণার্থীদের সুযোগ-সুবিধা—সবকিছুই নাকি এই সিন্ডিকেটের ইচ্ছা অনুযায়ী পরিচালিত হয়।

একাধিক প্রশিক্ষণার্থী অভিযোগ করেন, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ কথা বললে তাকে সুবিধাবঞ্চিত করা হয়। কেউ প্রতিবাদ করলে কোর্স ফির টাকা ফেরত না দিয়ে উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয়।

প্রশিক্ষণার্থীদের ওপর প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মূল উদ্দেশ্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। কিন্তু সিন্ডিকেট সংস্কৃতি থাকলে প্রশিক্ষণের গুণগত মান ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। প্রশিক্ষণার্থীরা ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকলে তাদের শেখার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে।

এক প্রশিক্ষণার্থী বলেন,
“আমরা এখানে এসেছি দক্ষতা শিখতে। কিন্তু প্রতিবাদ করলে সমস্যা হবে—এই ভয় আমাদের সব সময় তাড়া করে।”

প্রশাসনিক দায় কোথায়

প্রশ্ন উঠছে, এত দীর্ঘ সময় একই কর্মস্থলে পদায়ন থাকা সত্ত্বেও কেন বদলি নীতি কার্যকর হয়নি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নজরদারির ঘাটতি, তদারকির দুর্বলতা কিংবা প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়—কোনটি দায়ী, তা স্পষ্ট নয়।

অভিযোগ রয়েছে, অধ্যক্ষ নিজের পছন্দের প্রশিক্ষকদের নিয়ে সিন্ডিকেটকে কার্যত প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তবে অধ্যক্ষ প্রকৌশলী মো. গোলাম কবির এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,
“কোনো প্রশিক্ষণার্থী আমার কাছে অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,
“এই বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ভালো বলতে পারবে।”

নীতিমালা বনাম বাস্তবতা

সরকারি চাকরি বিধিমালার মূল উদ্দেশ্য হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঠেকানো। কিন্তু বরিশাল টিটিসির চিত্র বলছে, নীতিমালা থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে। দীর্ঘদিন একই জায়গায় কর্মরত থাকার ফলে ব্যক্তিগত প্রভাব, অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ ও সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার আশঙ্কা বাড়ে—যার উদাহরণ হিসেবেই বরিশাল টিটিসিকে তুলে ধরছেন সংশ্লিষ্টরা।

কী বলছেন সচেতন মহল

সচেতন মহলের মতে, বিষয়টি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি সরকারি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। তারা মনে করছেন, বরিশাল টিটিসিতে দীর্ঘ পদায়ন ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ নিয়ে নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্ত, বদলি নীতির বাস্তবায়ন এবং প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

সামনে যে প্রশ্নগুলো

কীভাবে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুই–তিন দশক ধরে একই ব্যক্তিরা কর্মরত থাকছেন?

বদলি নীতি কার্যকর না হওয়ার দায় কার?

সিন্ডিকেটের অভিযোগ সত্য হলে প্রশিক্ষণার্থীদের অধিকার সুরক্ষিত হবে কীভাবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না মিললে বরিশাল টিটিসির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নিয়ে আস্থার সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বদলি নীতিমালা কী বলছে

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রণীত সরকারি কর্মচারী (বদলি) নীতিমালা অনুযায়ী,

“একই পদ বা একই কর্মস্থলে একজন সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর টানা তিন বছরের বেশি অবস্থান করা বাঞ্ছনীয় নয়, বিশেষত সংবেদনশীল ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে।”

এছাড়া সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালাতে বলা হয়েছে,

“দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে অবস্থানের ফলে স্বার্থের সংঘাত, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের সম্ভাবনা সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে।”

কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মতো প্রতিষ্ঠানে এই বিধান আরও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা, কারণ এসব প্রতিষ্ঠানে সরাসরি সাধারণ নাগরিক ও প্রশিক্ষণার্থীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

আইনগত বিশ্লেষণ: সিন্ডিকেট অভিযোগের গুরুত্ব

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে

  • দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকা কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করেন,

  • প্রশিক্ষণার্থীদের হয়রানি বা সুবিধা বঞ্চিত করেন,

  • এবং অভিযোগ সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা না নেয়,

তাহলে তা প্রশাসনিক অবহেলা এবং ক্ষেত্রবিশেষে ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

একজন প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ বলেন,
“নীতিমালা লঙ্ঘনের মাধ্যমে যদি কোনো গোষ্ঠী সুবিধা গ্রহণ করে এবং সাধারণ সেবা প্রত্যাশীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাহলে তা তদন্তযোগ্য অপরাধের আওতায় পড়ে।”

ঊর্ধ্বতন দপ্তরের বক্তব্য

এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) বলেন,
“কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করেন এবং তা থেকে অনিয়ম বা অভিযোগের সৃষ্টি হয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়। লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন,
“বদলি নীতিমালা বাস্তবায়ন আমাদের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। কোনো ব্যত্যয় হলে তা খতিয়ে দেখা হবে।

 

সর্বশেষ  গুরুত্বপূর্ণ  সব  সংবাদ, ছবি ,অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও লেখা পেতে আমাদের  ফেসবুক পেইজে  লাইক  দিয়ে  অ্যাকটিভ  থাকুন।  ভিজিট করুন : http://www.etihad.news

অনলাইন  নিউজ পোর্টাল  ইত্তেহাদ নিউজে  লিখতে  পারেন  আপনিও। লেখার বিষয়  ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন  [email protected] ঠিকানায় ।

সংবাদটি শেয়ার করুন....
ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক :

ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক :

About Author

etihad news is one of the famous Bangla news portals published from Abudhabi-UAE. It has begun with a commitment to fearless, investigative, informative, and independent journalism. This online portal has started to provide real-time news updates with maximum use of Smart Technology.