রুমা মোদক : কিশোর গ্যাং শব্দটির সঙ্গে ঠিক কবে পরিচয় ঘটেছিল? খেলার সাথি, গলাগলি কিংবা দলাদলির দিনগুলো আমাদের, পাড়ার মাঠে বয়সভেদে ফুটবল দৌড় আর আইসক্রিম ভাগাভাগির কৈশোরের দিনগুলো কবে থেকে কিশোর গ্যাংয়ের পাল্লায় পড়ল? আমি ঠিক মনে করতে পারছি না।
খুব মনে পড়ছে, শবে বরাতের রাতে আমিন বাজারে কিশোদের পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনাটি। মনে আছে এই তো মাত্র সেদিন মিন্নির প্রেম বিষয়ক হত্যাকাণ্ডটি তোলপাড় করেছিল সারা দেশ।
আর এখন কিশোর গ্যাং তো দেশব্যাপী এক আতঙ্কের নাম। সারা দেশের আনাচে-কানাচে, রাজধানী থেকে মফস্বল কোথায় নেই এর দৌরাত্ম্য?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী ১০ থেকে ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত সময়সীমাকে বলা হয় বয়ঃসন্ধিকাল। এডোলেন্সেস মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। যে সময়টিতে মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো ঘটে। শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক। ইস্ট্রোজেন হরমোন নিঃসরণের কারণে শারীরিকভাবে ছেলেদের পুরুষালি শারীরিক লক্ষণগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মেয়েদেরও নারীত্বের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানসিকভাবেও এই সময়টিও খুব নাজুক। আবেগিক বিকাশের কারণে তাদের হরমোন নিঃসরণের ফলে নানা কৌতূহল, চাঞ্চল্য দেখা দেয়। যৌনতা বিষয়ক ফ্যান্টাসি তৈরি হয়। মুড সুইং, লজ্জা সংকোচ বাড়ে। তাদের নিজস্ব জগৎ তৈরি হয়। নিজেকে সে যথেষ্ট বুদ্ধিমান মনে করে। অভিভাবকের শাসন তাদের কাছে বন্ধন মনে হয় ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে বই-পুস্তক, জার্নাল আর অন্তর্জালে।
মনোবিজ্ঞান এবং চিকিৎসা শাস্ত্রেও এই বয়সটাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এই বয়সের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও।
একটা সময় ছিল, সুস্থির আর সম্ভাবনার। অপার স্বপ্নের। সামনে আদর্শ ছিল, উদ্দেশ্য ছিল। অনুকরণীয় নেতা ছিল। কিশোরদের কৈশোর খেলার মাঠ পেরিয়ে ধাবিত হতো সেই সম্ভাবনা আর স্বপ্নের দিকে। আদর্শে উজ্জীবিত হওয়ার প্রথম পাঠ তারা পেত কৈশোরেই। হাত ধরে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো গাইড ছিল। কিশোরদের একাডেমিক পাঠ্য বইয়ের নিচে আউট বই ছিল। কত মাসুদ রানা, দস্যু বনহুর আর ফেলুদা কিশোরদের গড়ে উঠতে থাকা মনকে উদ্দীপিত করে তুলত ভবিষ্যতের ইশারায়। পাড়ার মাঠে ফুটবল খেলতে থাকা কিশোররা তরুণ হতো ভবিষ্যতের কাক্সিক্ষত নাগরিক হয়ে। পাড়া, শহর কিংবা এলাকার ভরসার স্থল হয়ে উঠত এই কিশোররা।
তারা তরুণ হতো, পাড়ার মেয়েরা তাদের প্রেমে পড়ত। তারাই একদিন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আমলা-এমনকি মুদি দোকানদার হলেও মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষই হতো।
আমি আসলে তল খুঁজে শেষ বিন্দু পাই না এই অবক্ষয়ের শুরুর। কবে থেকে তারা এই সম্ভাবনার অনন্ত দরজা পায়ে মাড়িয়ে অন্ধকার জগতে প্রবেশ করল? কবে থেকে উদ্দীপ্ত কৈশোরকে গ্রাস করল কিশোর গ্যাং নামের ভয়ংকর পরিণতি।
বলা বাহুল্য এ সার্বিক অবক্ষয়েরই অনিবার্য ফসল। যখন কোনো জাতির সামনে উল্লেখ করার মতো কোনো গন্তব্য থাকে না, অনুকরণ করার মতো নেতৃত্ব থাকে না, ব্যক্তির ঊর্ধ্বে কোনো সামষ্টিক স্বার্থ থাকে না তখন কৈশোরের পরিবর্তনশীল মন সহজেই ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়।
কোমল কাদামাটির মতো গড়ে উঠা মন যখন চোখের সামনে দেখে কেবল অর্থ আর ক্ষমতার মর্যাদা, যখন দেখে কেউ সেই অর্থ আর মর্যাদার উৎস নিয়ে কোনো প্রশ্ন তো করেই না বরং রাতারাতি তার সামাজিক সম্মান বেড়ে যায় বহুগুণে, তখন কিশোর ছেলেটি ভালো-মন্দ বিবেচনাহীন সেই অর্থ, সম্মান আর মর্যাদাকেই ধ্যান-জ্ঞান লক্ষ্য মনে করে তা যত অসৎ পথেই অর্জিত হোক না কেন।
নীতি-আদর্শের বালাই নেই কেবলই পেশি আর অর্থের ঝনঝনানিতে যে রাজনীতি কলুষিত কোমলপ্রাণ কিশোররা তার প্রধান লক্ষ্য। ক্ষমতালিপ্সু, আদর্শহীন নেতৃত্ব তার ভবিষ্যৎ নিষ্কণ্টক করার জন্য এই কিশোরদের লক্ষ্য করে তাদের হাতে তুলে দেয় অস্ত্র আর মাদকের মতো ভয়াবহ হাতিয়ার। আর কিশোররা হয়ে উঠে ভয়ংকর।
ইন্টারনেটে অবাধ দুনিয়ায়ও এর জন্য কম দায়ী নয় বোধ করি। কারণে অকারণে, প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে কিশোরদের হাতে তুলে দিতে হয় অন্তর্জালের দুনিয়া। ফুলের কাছে মৌমাছি যায় মধুর খোঁজে, ভোমরা বিষের খোঁজে আর মানুষ যায় সৌন্দর্যের খোঁজে।
অন্তর্জালের দুনিয়ায় সবাই যার যার প্রয়োজন খুঁজে নিতে পারে। সেই সুযোগ উন্মুক্ত। কিশোর সেই সুযোগে পথ হারিয়ে ফেলে নিষিদ্ধতার চোরাগলিতে। মস্তিষ্কে নিঃসরিত ডোপামিনের কার্যকারিতায় জড়িয়ে পড়ে নানা অপকর্মে। চুরি, ছিনতাই, টিজিং, আধিপত্য বিস্তার নানা কিছুতে ঝুঁকে পড়ে তারা দলবেঁধে। দলে দলে চর দখলের মতো পাড়া দখলের লড়াই। বড় ভাইসুলভ নেতৃত্বের আনুগত্যের লোভে ইঁদুর দৌড়।
এই কিশোররা কারা? এরা আপনার-আমারই সন্তান। আমাদের নাড়িছেঁড়া ধন, হাড়-মজ্জা উজাড় করা ভালোবাসায় বড় করে তোলা সন্তান। তারা কখন, কোন ফাঁকে শাসন আর আদরের মুঠো গলে এমন ভয়ংকর হয়ে উঠে তা যদি আমরা না জানি, না নিয়ন্ত্রণ করতে পারি তার দায় অভিভাবক হিসেবে আমাদেরও কম নয়।
কিন্তু আমরা যারা অভিভাবক, আমাদেরও তো নিয়ত আর কর্মে অসততার অভাব নেই। শৈশবেই সন্তানকে শিখাই, ক্লাসে সবাইকে পেছনে ফেলে ফার্স্ট হতে হবে। শিখিয়ে দিই নিজের টিফিনটা নিজেই যেন সবটুকু খায়, কাউকে ভাগ না দেয়। পরীক্ষার হলে কোন বন্ধুকে সাহায্য না করে। বড় হওয়ার পথে পথে এত স্বার্থপরতা শিখিয়ে আমরা আশা করি মানবিক প্রজন্ম।
এই শিশুরা কৈশোর থেকেই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে নিজের প্রতিষ্ঠার পথ খুঁজে নানা উপায়ে। আমরা আমাদের উচ্চাকাক্সক্ষা দিয়ে, আমাদের স্বার্থপরতা দিয়ে যে সন্তানকে গড়ে তুলছি সেই সন্তান যে আমাদের চোখের সামনে অচেনা হয়ে উঠছে তার দায় কেবল কি আমরা দিচ্ছি? দিচ্ছে পুরো সমাজ আর বৃহত্তর ভাবে দেশ।
এই কিশোর গ্যাং যেন শেকড়ের পচন। যে বৃক্ষের গাছ হয়ে ফল দেওয়ার কথা, সেই গাছ অকালে মৃত্যুবরণ করছে জাতির সমূহ স্বপ্ন নিয়ে।
কিশোরদের নষ্ট হওয়ার আরেকটি অন্যতম কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। তথাকথিত শিক্ষককুল।মনোবিজ্ঞান বলে এই বয়সে শিশুর মধ্যে ব্যক্তিত্ব জাগ্রত হয়, পিতামাতার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে তাদের নিজস্ব জগৎ গড়ে ওঠে। তাদের বন্ধুবান্ধব হয়। তারা দলবদ্ধ হয়। নেতৃত্ব দিতে শিখে। এই বয়সেই অপার কৌতূহল তাদের জীবনের কিংবা সমাজের গলি ঘুপচি শিখায়। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কিংবা তথাকথিত শিক্ষককুল কোনোভাবেই এই নাজুক বয়সটাকে বিবেচনায় রাখে না। আমি আমার অভিজ্ঞতায় যে কয়টা স্কুল দেখেছি এই প্রত্যন্ত এলাকার, সর্বত্রই এই কিশোরদের ‘বালাই’ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।
কোথাও তারা তাদের প্রশ্নের উত্তর পায় না। কৌতূহলের নিবৃত্তি দূরে থাকুক তাদের কৌতূহলকে অন্যায় হিসেবে বিবেচনা করে। কৈশোরের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশকে বেয়াদবি মনে করে তাদের অপমানিত করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের সঙ্গে ছাত্রের সদ্ভাব এ দেশে এক অলৌকিক বিষয়। ফলে কৈশোরের শেষ পর্যন্ত কোনো আশ্রয় থাকে না।
কোথাও সে মনের কথা খুলে বলতে পারে না। সে অসহায় বোধ করে। শেষ পর্যন্ত এই অসহায়ত্বের সুযোগটুকু নেয় এলাকার বখে যাওয়া বড় ভাই, সামান্য সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে কিশোরদের টেনে নেয় সর্বনাশা গ্যাংয়ের দিকে। বড় ভাইয়ের আধিপত্য সুরক্ষিত হয় যার বিনিময়ে।
আবশ্যিক যে প্রশ্নের উত্তরটি না জানলেই নয়, তা হলো এর থেকে পরিত্রাণের কী উপায়। যে জাতির শেকড় পচে যাচ্ছে ক্রমাগত সে জাতির সামনে তো কেবল হতাশার অথৈজল। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় যদি খুঁজতে যাই তা আমাদের জন্য কেবলই উপরিতল খোঁজা হবে। মূলত এর জন্য দরকার সমাজ তাত্ত্বিকদের গভীর গবেষণা। আর দরকার সমাজের আমূল সংস্কার। যে সংস্কারের আবশ্যিক অনুষঙ্গ হয়ে আসবে শিক্ষাব্যবস্থারও সংস্কার। যে সংস্কার শিক্ষা কেবলই পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রমথ চৌধুরীর ভাষায় দর্জির হাতে একছাঁটে কাটা কাপড়ের শৃঙ্খল ভেঙে হয়ে উঠবে শিক্ষার্থীর আনন্দের উৎস। না পারার ব্যর্থতা তার জীবনকে ব্যাহত করবে না।
বরং প্রতিটি কিশোর ভেতরের নিজস্ব আগ্রহ আর মেধা আবিষ্কার করে তার পরিচর্যায় জীবনকে সফল করে তুলতে পারে। কিশোরদের সামনে খুলে দিতে হবে স্বপ্ন আর সম্ভাবনার দ্বার। অভিভাবকের সচেতনতা আর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব একে অপরের পরিপূরক হয়ে না উঠলে কিশোরদের রক্ষা করা অসম্ভব। অভিভাবক যতই সচেতন হন, সন্তান যখন ঘরের বাইরে রঙিন দুনিয়ার হাতছানির সন্ধান পাবে, বয়সের কারণেই অভিভাবকদের পক্ষে তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা মুশকিল হবে। যে সমাজে ঘর থেকে বের হলেই নষ্ট হওয়ার হাজারটা ফাঁদ, সেখানে তো অভিভাবকরাও এই সমাজ সিস্টেমের ক্রীড়নক বৈ কিছুই নয়।
পাড়ায় পাড়ায় সত্তর-আশি দশকের মতো ফুটবল টুর্নামেন্ট হোক, নব্বই দশকের মতো ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হোক। পাঠের জন্য লাইব্রেরি হোক, ইন্ডোর গেমসের জন্য ক্লাব হোক। আমাদের কিশোররা খারাপ হবে কখন? কিশোর গ্যাং তৈরি করবে কখন?
সব খেলার মাঠ দখল করে আমরা বিল্ডিং বানিয়েছি, ক্লাবঘরকে বানিয়েছি পণ্য কেনাবেচার মল, তার হাত থেকে বই কেড়ে নিয়ে তুলে দিয়েছি মোবাইল ইন্টারনেট। নির্মল কৈশোর তুলে নিয়ে তাকে দেখিয়ে দিয়েছি তথাকথিত প্রতিষ্ঠার পথ। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। নরম কাদামাটি দিয়ে যেকোনো পুতুল গড়া যায় সে শিব কিংবা বাঁদর। আমরা বাঁদর গড়েছি। আমরা মানে আমরা রাজনীতিবিদরা, আমরা শিক্ষকরা, আমরা অভিভাবকরা। দায়ী তো আর কোমলমতি কিশোররা নয়। কোনোভাবেই নয়।
সেই আমরা যারা তাদের নষ্ট করেছি, এখন আমাদেরই দায়িত্ব তাদের উদ্ধার করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেওয়া। আমাদেরই কর্তব্য তাদের জীবনের মূলস্রোতে তুলে দেওয়া। এর জন্য পথ খুঁজতে হবে আমাদের, অভিভাবকদের, শিক্ষকদের, নেতাদের সর্বোপরি রাষ্ট্রের।
পৃথিবীতে কোনো দেশে এমন কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠেনি। আন্ডার ওয়ার্ল্ড হয়তো আছে, বিচিত্র অপরাধের নগ্ন দুনিয়া আছে। কিন্তু কিশোর গ্যাং, অপ্রাপ্ত বয়স্ক কৈশোরের পচন আমাদের মতো কোথাও শুনিনি আর। আর এই পচন আজকের নয়, এর মাশুল জাতিকে দিতে হবে পুরো ভবিষ্যৎ। আমরা যতক্ষণ না তার ভয়াবহতা টের পাব ততক্ষণ এর থেকে পরিত্রাণের পথও খুঁজে পাব না।
লেখক
* সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ সব সংবাদ, ছবি ,অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। ভিজিট করুন : http://www.etihad.news
* অনলাইন নিউজ পোর্টাল ইত্তেহাদ নিউজে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়