আবু আহমেদ: খালেদা জিয়াকে একবাক্যে বলা যায়-‘She was a great leader.’ খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বা পরেও যখন দেশের গুরু দায়িত্ব পালন করেছেন, তখন পুরো দেশে তিনি ছিলেন ‘ইউনিফাইং ফোর্স’। বাংলাদেশের জনগণকে একসঙ্গে রাখার জন্য তিনি ছিলেন আশ্রয়স্থল। গণতন্ত্রের ছায়ায় জাতিবিভেদ থেকে দেশকে রক্ষা করেছেন তিনি। নির্লোভ, দৃঢ়চেতা, আপসহীন এবং সত্যিকারের একজন দেশপ্রেমিককে স্বৈরাচারী সরকার অনেক কষ্ট দিয়েছে। তার এ কষ্টের সঙ্গে সারা দেশের মানুষ কষ্ট পেয়েছেন।
বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার খালেদা জিয়াকে তিলে তিলে কষ্ট দিয়েছে-এরই ধারাবাহিকতায় এই নেতা একসময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। আজ খালেদা জিয়া চলে গেছেন, কিন্তু কোটি কোটি মানুষ তার জন্য অশ্রুপাত করছে। আরেকজন খালেদা জিয়া এদেশে আসবেন না। তিনি আমার এলাকার ছিলেন। তবে সেটা বড় কথা নয়। আসলে তিনি ছিলেন পুরো বাংলাদেশের। বাংলাদেশের জনগণের মণিকোঠায় ছিলেন। দেশের যে কোনো অঞ্চল থেকে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন, সেখান থেকেই জয়লাভ করতেন।
দেশে যদি প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেম থাকত, তাহলে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন, যিনি এখানেও নিশ্চিতভাবেই জয়লাভ করতেন। তাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কোনো লোক ছিল না। তিনি ছিলেন বিশাল জনপ্রিয় একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব। এর অবশ্য কারণও ছিল; সেটা হলো, তার অগাধ দেশপ্রেম। তার অন্য কোথাও বাড়িঘর ছিল না, কোনো সম্পদ ছিল না। তিনি ইচ্ছা করলে বিপুল অর্থবৈভবের মালিক হতে পারতেন, বিদেশের মাটিতে বাড়িঘর, সহায়সম্পত্তি গড়তে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটা করেননি। কোনো দেশে আশ্রয় নেওয়া বা কোনো দেশে সম্পদ পাচার করার মতো চিন্তা কখনোই তার মাথায় আসেনি। কোনো লোভ তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। অগাধ দেশপ্রেম থাকলেই সেটা সম্ভব।
সোজা কথায় বলা যায়, তার মতো লিডার বাংলাদেশ আর পাবে না। বিশাল এ জনপ্রিয়তার মূলে ছিল তার দৃঢ়তা, সততা, সর্বোপরি দেশপ্রেম। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছে তিনি কখনোই নতজানু হননি। ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিনি সব সময়ই সোচ্চার ছিলেন। আবার প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে শত্রুর কাতারেও ফেলে দেননি। দুদেশের বন্ধুত্বকে বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন রক্ষক এবং পাহাড়ের মতো শক্তিশালী। আশা করি, বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বে যারা এসেছেন, তারা তার নীতিকে অনুসরণ করবেন। তারা যদি বেগম খালেদা জিয়ার এ নীতি থেকে সরে যান, তাহলে ওই স্বৈরাচার আর তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ অর্থে কে স্বাধীন থাকবে, সেটাই মানুষ দেখতে চায়। মানুষ নতজানু এবং কোনো দুর্বল নেতৃত্বকে কখনোই পছন্দ করে না। সুতরাং, আমরা হয়তো খালেদা জিয়ার মতো আরেকজন নেতা পাব না, কিন্তু যারা নেতৃত্বে আসছেন, তারা যেন খালেদা জিয়ার সেই দৃঢ়তাকে বজায় রাখেন। বিএনপির আসল শক্তি তো ওইখানেই। সুতরাং এটা আমাদের ধরে রাখতে হবে। শুধু একটি নির্বাচন, সেক্যুলারিজম, গতানুতিক চেতনাবিষয়ক কিছু কথা-এগুলো হলে তো সেটা আওয়ামী লীগের আদর্শিক মতবাদের কাছাকাছি চলে যায়। আমরা সে ধারায় চলতে চাই না।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে আমাদের বুঝতে হবে। তার বিপরীতে ফ্যাসিস্ট, যিনি পালিয়ে গেছেন, তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারক-বাহক ছিলেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। আমাদের এই পার্থক্য অনুধাবন করতে হবে। বুঝতে হবে, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ স্বাধীনতার চেতনাকে বহন করে।
যাহোক, আমরা আশা করি, বিএনপি নেতারা, যারা এখন সামনে এসেছেন এবং থাকবেন, তারা যেন বেগম খালেদা জিয়ার নীতিকে ধারণ করেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়ার নীতি থেকে বিচ্যুত হলে বিএনপির রাজনীতির কোনো অর্থ থাকে না। বিএনপি যদি এ পথে পা বাড়ায়, তাহলে বিশাল জনপ্রিয়তা হারাবে। মানুষের অন্তর থেকে বিএনপির নাম-নিশানা মুছে যাবে। আমরা চাই না সেটা হোক। আমরা চাই বিএনপি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শকে সামনে রেখে এগিয়ে যাক। মানুষ স্বাধীনতা চায়। কথা বলার অধিকার চায়। গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে চায়। এ ধারাকে সমুন্নত রেখেই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তবেই জনগণের কল্যাণ, রাষ্ট্রের কল্যাণ। মানুষ কারও ডোমিনেন্সে থাকতে চায় না। প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রের আধিপত্যবাদের আওতায় থাকতে চায় না। আমাদের স্বকীয়তা নিজস্ব ধারা বজায় রেখেই আমরা চলতে চাই। তবে আমরা কাউকে শত্রুও বানাতে চাই না। প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে ইকুয়ালিটি ট্রিটমেন্টটা যেন পাই, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা ।
গত ১৫ বছর আওয়ামী সরকারের সময়ে হতাশা এবং ক্ষোভের সঙ্গে লক্ষ করলাম, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েও স্বাধীন নেই। জনগণ এমনটাই দেখেছে চোখের সামনে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যেত না। প্রতিবাদ করতে গেলে গুম হতে হতো, খুন হতে হতো। আয়নাঘরের মতো ভয়ংকর টর্চার সেল নির্মিত হয়েছিল। সেখানে মানুষকে আটকে রেখে চরমভাবে নির্যাতন করা হতো। ভয়ে-ডরে কেউ কোনো কথা বলতে পারত না। গণতন্ত্রকে পুরোপুরিভাবে কবর দেওয়া হয়েছিল। আমরা এর পুনরাবৃত্তি চাই না। আমরা চাই দেশ পুনরায় গণতন্ত্রে ফিরে আসুক। প্রকৃত গণতন্ত্র হচ্ছে, মানুষ যাকে চায়, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সেই হবে রাষ্ট্রনায়ক। কিন্তু বিগত সরকারের আমলে তার অভাব আমরা দেখেছি। রাতের ভোট, ভোট জালিয়াতির মতো নানারকম চিত্র আমাদের দেখতে হয়েছে। আসলে বাংলাদেশের মতো দেশে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দরকার, যেটা আমাদের শাসনতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক চেতনার বিষয়। কিন্তু স্বৈরাচারী সরকার ২০১৩ সালে এটাকে কবর দিয়েছে তার নিজের সুবিধার জন্য। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সমর্থনেই এসব করেছে। আমরা সে গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে চাই। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত যে কোনো সরকারই আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র এনেছিলেন। যেটা পুরো পৃথিবীতে বিরল একটি ঘটনা। বেগম খালেদা জিয়া তার শাসনামলে বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারাকে অনুসরণ করেছেন। বেগম খালেদা জিয়া নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই নির্বাচিত হয়েছেন, রাতের ভোট এবং ভোট জালিয়াতির মাধ্যমে নয়। তার নিজের অধীনে নির্বাচন করেননি। তিনি সব সময়ই গণতন্ত্রকে সম্মান করেছেন। খালেদা জিয়ার শাসনামলে দেশ ঋণগ্রস্ত ছিল না। এখন আমাদের ওপর বিশাল ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে গেছে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার। অনেক প্রকল্পের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। যে প্রকল্প ২০ হাজার কোটি টাকায় করা যেত, সেটা ৩০ হাজার কোটি টাকায় সম্পন্ন হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে এমন প্রকল্প জালিয়াতি হয়নি। সামনে যে সরকারই আসবে, বিষয়গুলো তারা বিবেচনায় নেবে বলে আশা করি।
স্বৈরাচারী শাসকের মতো দেশ চালাতে গেলে এদেশের মানুষ সেটা বরদাশত করবে না। দেশে জবাবদিহি থাকতে হবে। যারা লিডার, তাদের ক্লিন ইমেজ থাকতে হবে। তাদের সততা থাকতে হবে। ক্ষমতায় যাওয়ার পর কী কী সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্র থেকে নিয়েছেন বা নিচ্ছেন, এগুলোর একটা জবাবদিহি থাকতে হবে। মানুষ এখন অনেকটাই সচেতন। আগের মতো যে কেউ একজন নির্বাচনে দাঁড়ালেই পাশ করে ফেলবে, সেটা এখন আর হবে না। যিনি দাঁড়াচ্ছেন, তিনি মানুষটা কেমন, সেটা মানুষ দেখতে চায়।
এদেশ অনেক দুর্ভাগা। একসময় যারা আমাদের বন্ধু ছিল, তাদের বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার শত্রু বানিয়েছে। একটা রাষ্ট্রের কাছে ইচ্ছা করে নতজানু হয়েছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র এখন বলতে চাচ্ছে, আমরা এভাবে চাইনি, এটা তোমাদের সরকারই করেছে। এজন্য গণতন্ত্র বাদ দিলে যেটা হয়, সেটা হচ্ছে অন্য কারও সেবাদাস হতে হয়, সেটাই হয়েছে। যিনি পালিয়ে গেছেন, তিনি দেশের গণতন্ত্র বাদ দিয়ে অন্য কারও কাছে সেবাদাস হয়েছেন। গণতন্ত্রের সুফল হচ্ছে, আমি আমার জনগণের কাছে দায়ী। জনগণ না চাইলে, আমি চলে যাব। এ মানসিকতা যার নেই, তার তো দেশের সরকারপ্রধান হওয়াই উচিত নয়। ওটা আমাদের দুর্ভাগ্য ছিল।
শাসনতন্ত্র থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার হটিয়ে দেওয়া যেদিন হয়েছে, সেদিন থেকেই দেশের দিগন্তে কালো মেঘ জমা হয়েছে। এর পরের ১৫ বছর দেশে কী হয়েছে, তা আমাদের কারোরই অজানা নয়। যাইহোক, বেগম খালেদা জিয়া আজ আমাদের মাঝে নেই। জাতি হারিয়েছে একজন শ্রেষ্ঠ অভিভাবককে। বেগম খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের মানুষ ভুলবে না। তিনি বেঁচে থাকবেন তার আদর্শে, অগাধ দেশেপ্রেমে। আমরা তার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।
অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার
আবু আহমেদ : অর্থনীতিবিদ, পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক; চেয়ারম্যান, ইনভেস্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ
ইত্তেহাদ নিউজ, এয়ার পোর্ট রোড, আবুধাবী ,সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইমেইল: [email protected], web:www.etihad.news
এম এম রহমান, প্রধান সম্পাদক, ইত্তেহাদ নিউজ, এয়ার পোর্ট রোড, আবুধাবী, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে প্রকাশিত ও প্রচারিত